Tuesday, April 8, 2014

এ কেমন নৃশংসতা!



ঢাকা, মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল ২০১৪, ২৫ চৈত্র ১৪২০
(উপ-সম্পাদকীয়)
এ কেমন নৃশংসতা!
মো. মুজিবুর রহমান
কয়েক দিন আগে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী শিক্ষার্থী সায়াদ। কেন এ নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটল তার কিছু সম্ভাব্য কারণও পত্র-পত্রিকায় উঠে এসেছে। তবে এটা কোনো ছাত্রসংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ঘটেনি বলে এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে। এ ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন বিগত বছরে দেশজুড়ে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিপর্যস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এখন উত্তাল হয়ে আছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সায়াদ হত্যাকাণ্ডের প্রায় পর পরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হয়েছে আরেক মেধাবী ছাত্রহত্যা। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে সংঘটিত পর পর দুটি হত্যাকাণ্ডে আমরা বিস্ময়ে হতবাক। এ কেমন নৃশংসতা! কেন মধ্যযুগীয় বর্বরতা! যারা এসব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছেন তারা কী করে দেশের প্রচলিত আইন-আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সাহস পান সেটাই সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার!
আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, এ দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করার মাধ্যমে বহু বছর ধরে ছাত্রনেতা নামধারীদের অনেকেই এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করছেন না। নিজেদের পকেট ভারি করতে গিয়ে তারা প্রায়ই টেন্ডারবাজিসহ আরো নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। এসব ঘটনা পুরো ছাত্ররাজনীতির ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করছে ব্যাপকভাবে। সন্দেহ নেই, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড দুটি ছাত্ররাজনীতিকে আবারো প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাত্ররাজনীতি চালু থাকবে কি থাকবে নাএ নিয়ে এখন পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা আরম্ভ হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদের নেতিবাচক ভূমিকাই এসব আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের কারণে এখন এ আলোচনা আরো জোরদার হবে বলে মনে হচ্ছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থিতিশীল ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপটে অনেকেই বলছেন, হাতেগোনা কিছু ছাত্রনেতা পড়ালেখা থেকে বিচ্যুত হয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকায় ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ছাত্রদের প্রধান দায়িত্ব নিয়মিতভাবে পড়ালেখা করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়সূচি মোতাবেক পরীক্ষাসহ অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা হলেও তারা নিয়মনীতি মেনে সেটা করতে চান না। উদ্বেগের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, মুষ্টিমেয় ছাত্রনেতা রাজনৈতিক দলগুলোর নাম ভাঙ্গিয়ে অনেক সময় নিজেদের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার সময়সূচি পাল্টিয়ে দেয়ায় প্রভাব বিস্তার করেন। তাদের দোর্দণ্ড প্রতাপের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রায় সময়ই অসহায় হয়ে পড়তে দেখা যায়। এমনকি তাদের সংঘবদ্ধ আক্রমণের মুখে পুরো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে অধিষ্ঠিত অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার খবরও পাওয়া যায়। কোনো কোনো শিক্ষক নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ছাত্রনেতাদের ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অনেক সময় ক্যাম্পাসে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার পর যারা অপরাধী তাদের রক্ষা করার জন্যও অনেক শিক্ষক আড়ালে কাজ করেন। ফলে ছাত্রনেতারা নিজেদের স্বার্থ আদায়ের জন্য আরো বেশি উৎসাহিত হন। এর জন্য এককভাবে ছাত্রনেতারা এবং ছাত্ররাজনীতি দায়ী কিনা সেটা ভেবে দেখতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও ভাবতে হবে। কারণ প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ভেতরে ভেতরে অনেক শিক্ষক ক্লাসরুমে পড়ানোর বদলে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন এবং সুযোগ বুঝে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেন। এটা যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন জানে না তা নয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে স্বার্থান্বেষী শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ছাত্রনেতাদের লেলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। তারা উস্কানি দিয়ে ছাত্রদের ক্ষিপ্ত করে পুরো পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তোলেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র সায়াদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংক্ষেপে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানেও পরীক্ষাকে পিছিয়ে দেয়ার আলোচনা নিয়ে তার সঙ্গে তারই সহপাঠীদের প্রথমে বাকবিতণ্ডা ঘটে এবং পরে তাকে কয়েকজন মিলে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলে। আমরা যে কোনো হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে। যে পরিস্থিতিতে সায়াদকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। এ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আবারো প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে যে, মানুষ মেরে ফেলার মতো সহজ কাজ বাংলাদেশে আর নেই। প্রায়ই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিশু থেকে আরম্ভ করে নানা বয়সী মানুষ মেরে ফেলার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাজেই যে কোনো হত্যাকাণ্ডের উপযুক্ত বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে দ্রুত। আর এটা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড আর না ঘটে তার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গড়ে তুলতে হবে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। প্রয়োজনে ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যভূমিকা নিয়েও ভাবতে হবে নতুন করে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ
mujibur29@gmail.com

Wednesday, April 2, 2014

মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতা



ঢাকা, বুধবার, ২ এপ্রিল ২০১৪, ১৯ চৈত্র ১৪২০, ১ জমাদিউসসানী ১৪৩৫
(দৃষ্টিকোণ)
মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতা
মো. মুজিবুর রহমান
প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের দিয়ে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করিয়ে তা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে অনেক আগে থেকেই সরকারিভাবে নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের সহায়তায় প্রথম আয়োজন করা হয় ২০১১ সালের মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতা। এরপর ২০১২ সালের সেরা শিক্ষক নির্বাচনের জন্য একই ধরনের আরেকটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। এ দুটি প্রতিযোগিতার বিভিন্ন পর্বে অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে জাতীয় পর্যায়ে ১০ জন করে মোট ২০ জন সেরা শিক্ষক নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীকালে ই-এশিয়া এবং ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সেরা শিক্ষকদের পুরস্কার হিসেবে একটি করে ল্যাপটপ প্রদান করা হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের কাছে পড়ালেখা আরো আনন্দদায়ক করে তোলা, শ্রেণিকক্ষে পাঠ্য বিষয়ের কঠিন ও দুর্বোধ্য বিষয়বস্তু সহজ করে তুলে ধরার প্রয়াস, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীল ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আনন্দদায়ক ও শিখনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই একুশ শতকের উপযোগী জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা, শিক্ষকদের উত্সাহ দেয়া এবং শিক্ষাদান কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করা মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতার অন্যতম উদ্দেশ্য।
শিক্ষকদের তৈরি মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতার ওপর ভিত্তি করে টেলিভিশনে ২৬ পর্বের রিয়েলিটি শো সম্প্রচার করার পরিকল্পনাও রয়েছে। রিয়েলিটি শো করতে গিয়ে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে অংশগ্রহণকারী প্রতিযোগীদের ক্লাসরুম টিচিং সম্প্রচার করা হবে। এ অনুষ্ঠানে শ্রেণিকার্যক্রমের বিভিন্ন অংশ, বাংলাদেশের শিক্ষা বিকাশের ইতিহাস, আধুনিক শিক্ষাক্রম, শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া ও শিক্ষায় সহপাঠক্রমিক কার্যাবলীর ইতিবাচক প্রভাব ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন আকর্ষণীয় পর্ব উপস্থাপন করা হবে। এছাড়া পাঠদান সম্পর্কিত নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বেরও আয়োজন করা হবে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।
এটুআই প্রোগ্রামের উদ্যোগে টেলিভিশনে যে ধরনের রিয়েলিটি শো সম্প্রচার করা হবে তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ নতুন। এমনকি অন্যান্য দেশেও এ ধরনের রিয়েলিটি শো আয়োজন করার কথা শোনা যায় না। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আমরা সচরাচর যে সব রিয়েলিটি শো প্রচার হতে দেখে আসছি সেগুলো সাধারণত বিনোদনমূলক হয়ে থাকে। আর টেলিভিশনে প্রচারিত টক শোগুলোর বেশির ভাগ হয়ে থাকে রাজনীতি নির্ভর। অথচ আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের নিয়ে তেমন কোনো অনুষ্ঠানই প্রচারিত হয় না টেলিভিশনে। এবার আয়োজকরা জানিয়েছেন, শিক্ষা কার্যক্রমকে একটি আনন্দমূলক বিষয়ে পরিণত করার মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করা হবে, যেখানে বিনোদনের সুযোগ থাকবে, থাকবে শিক্ষামূলক উপস্থাপনও। এ ধরনের অনুষ্ঠান দেখে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট হবে, শিক্ষকদের উদ্যম বাড়বে এবং এ অনুষ্ঠানটি সামাজিকভাবে শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।
এখানে বলা দরকার, টেলিভিশনে প্রচারের উদ্দেশ্যে রিয়েলিটি শো আয়োজন করতে গেলে তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। কারণ বহু স্কুল পর্যবেক্ষণকালে আমরা দেখেছি, একেবারে গ্রামপর্যায়েও অনেক ভাল ও মেধাবী শিক্ষক রয়েছেন যারা শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু তাদের খুঁজে বের করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেই। সবাই জানেন, মেধাবী শিক্ষকদের মধ্যে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের হতাশা কাজ করে। ফলে তাদের অনেকেই সুযোগ খুঁজতে থাকেন শিক্ষকতা ছেড়ে দেয়ার। এভাবে মেধাবী শিক্ষকরা ঝরে পড়েন। শিক্ষার স্বার্থেই এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার।
এরই মধ্যে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতার প্রথম পর্ব শেষ হয়ে গেছে। এ প্রতিযোগিতায় এখন আর নতুন করে শিক্ষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। কাজেই অবশিষ্ট পর্বের ওপর ভিত্তি করে রিয়েলিটি শো সফল করে তুলতে হলে প্রতিযোগিতার পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে পত্রপত্রিকায় ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে এখন থেকেই। বিজ্ঞাপন দিতে হবে প্রচুর। সাধারণ মানুষদের জানাতে হবে, শিক্ষা জগতে সৃজনশীল কাজ করার রয়েছে বিরাট সুযোগ, সমাজ উন্নয়নে শিক্ষকরাও রাখতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং মেধাবী শিক্ষকরাই পারেন শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে গতিশীল রাখতে।
এ নিয়ে রেডিও ও টেলিভিশনেও প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতা এবং রিয়েলিটি শো নিয়ে শুধু শিক্ষক বাতায়নে (www.teachers.gov.bd) প্রচার চালানোই যথেষ্ট নয়। কারণ সব শিক্ষকের পক্ষে নানা কারণে ইন্টারনেট ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারের তেমন সুবিধাও নেই। কাজেই দেশজুড়ে অবস্থিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় রিয়েলিটি শো সম্পর্কে জানাতে হলে ব্যবহার করতে হবে পোস্টার পেপার ও লিফলেট। এ ব্যাপারে স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সম্পৃক্ত করা দরকার। এছাড়া জেলা পর্যায়ে অবস্থিত তথ্য অফিসের সহায়তায়ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রচার চালানো যেতে পারে। কারণ রিয়েলিটি শোর মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে যার সঠিক প্রচার এবং দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে আরো পরিচিত করে তুলবে। এমনকি বাংলাদেশ হতে পারে অনেক দেশের কাছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক।
লেখক : সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ
mujibur29@gmail.com
http://www.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDRfMDJfMTRfMV81XzFfMTIwMTY1

রিয়েলিটি শোর মাধ্যমে শিক্ষক নির্বাচন



এপ্রিল ২, ২০১৪, বুধবার : চৈত্র ১৯, ১৪২০
(বাতায়ন)
রিয়েলিটি শোর মাধ্যমে শিক্ষক নির্বাচন
মোঃ মুজিবুর রহমান
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল, ২০১৪
প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের দিয়ে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করিয়ে তা মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে ক্লাসরুমে ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে অনেক আগেই সরকারিভাবে নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের সহায়তায় প্রথম আয়োজন করা হয় ২০১১ সালের ডিজিটাল কনটেন্ট প্রতিযোগিতা। এরপর ২০১২ সালের সেরা শিক্ষক নির্বাচনের জন্য একই ধরনের আরেকটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। এ দুটি প্রতিযোগিতার বিভিন্ন পর্বে অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে জাতীয় পর্যায়ে ১০ জন করে মোট ২০ জন সেরা শিক্ষক নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীকালে ই-এশিয়া এবং ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সেরা শিক্ষকদের পুরস্কার হিসেবে একটি করে ল্যাপটপ প্রদান করা হয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না, শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের কাছে পড়ালেখা আরও আনন্দদায়ক করে তোলা, শ্রেণীকক্ষে পাঠ্য বিষয়ের কঠিন ও দুর্বোধ্য বিষয়বস্তু সহজ করে তুলে ধরার প্রয়াস, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনন্দদায়ক ও শিখনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই একুশ শতকের উপযোগী জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা, শিক্ষকদের উৎসাহ দেয়া এবং শিক্ষাদান কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতার অন্যতম উদ্দেশ্য। এরই ধারাবাহিকতায় ১৪টি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ এবং নির্বাচিত কয়েকটি পিটিআইতে এখন চলছে ২০১৩ সালের মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় রাউন্ড। এ প্রতিযোগিতায় মোট ৪টি রাউন্ড রয়েছে। প্রথম রাউন্ড থেকে শিক্ষক বাছাই আরম্ভ হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে শেষ রাউন্ডে গিয়ে সেখান থেকে ১০ জন সেরা শিক্ষক নির্বাচন করা হবে। তাদেরই পরবর্তীকালে পুরস্কার দেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, শিক্ষকদের তৈরি মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতার ওপর ভিত্তি করে টেলিভিশনে ২৬ পর্বের রিয়েলিটি শো সম্প্রচার করা হবে বলেও আয়োজকরা জানিয়েছেন। রিয়েলিটি শো করতে গিয়ে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে অংশগ্রহণকারী প্রতিযোগীদের ক্লাসরুম টিচিং সম্প্রচার করা হবে। এখানে শ্রেণী কার্যক্রমের বিভিন্ন অংশ, বাংলাদেশের শিক্ষা বিকাশের ইতিহাস, আধুনিক শিক্ষাক্রম, শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া, সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন আকর্ষণীয় পর্ব উপস্থাপন করা হবে। এছাড়া পাঠদান সম্পর্কিত নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বেরও আয়োজন করা হবে। এসব ছাড়াও থাকবে বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় পর্ব।
আয়োজকরা যে ধরনের রিয়েলিটি শোর আয়োজন করতে যাচ্ছেন তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ নতুন। এমনকি অন্যান্য দেশেও এ ধরনের রিয়েলিটি শো আয়োজন করার কথা শোনা যায় না। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আমরা যেসব রিয়েলিটি শো প্রচার হতে দেখে আসছি, সেগুলো সাধারণত বিনোদনমূলক হয়ে থাকে। আর টেলিভিশনে প্রচারিত টকশোগুলো মূলত রাজনীতিনির্ভর। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের নিয়ে তেমন কোনো অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় না টেলিভিশনে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রচলিত রিয়েলিটি শো হয়ে থাকে বিনোদন জগতের শিল্পীদের উপস্থিতিতে। অনেক সময় দর্শকদের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে এসব অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হয়। কখনও কখনও দর্শকদের নিয়ে পরিচালিত হয় প্রতিযোগিতামূলক পর্ব। দর্শকপর্বে যারা অংশগ্রহণ করেন, তাদের মধ্য থেকে বাছাই করে পুরস্কারও দেয়া হয়। অথচ আমাদের শিক্ষকরা বরাবরই থেকে যাচ্ছেন উপেক্ষিত।
এবার আয়োজকরা জানিয়েছেন, শিক্ষা নিয়ে রিয়েলিটি শো হবে ভিন্ন আমেজের, যা শিক্ষাক্ষেত্রে সংযোজন করবে নতুন মাত্রা। তাদের মতে, শিক্ষা কার্যক্রমকে একটি আনন্দমূলক বিষয়ে পরিণত করার মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করা হবে, যেখানে বিনোদনের সুযোগ থাকবে, থাকবে শিক্ষামূলক উপস্থাপনও। এ ধরনের অনুষ্ঠান দেখে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট হবে, শিক্ষকদের উদ্যম আরও বাড়বে এবং এ অনুষ্ঠানটি সামাজিকভাবে শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।
এখানে বলা দরকার, টেলিভিশনে প্রচারের উদ্দেশ্যে রিয়েলিটি শো আয়োজন করতে গেলে তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। কারণ বহু স্কুল পর্যবেক্ষণকালে আমরা দেখেছি, একেবারে গ্রামপর্যায়েও অনেক ভালো ও মেধাবী শিক্ষক রয়েছেন, যারা শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু তাদের খুঁজে বের করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেই। সবাই জানেন, মেধাবী শিক্ষকদের মধ্যে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের হতাশা কাজ করে সব সময়। ফলে তাদের অনেকেই সুযোগ খুঁজেন শিক্ষকতা ছেড়ে দেয়ার। এভাবে মেধাবী শিক্ষকরা ঝরে পড়েন। আমরা দেখি, সেরা কণ্ঠশিল্পী নির্বাচন করা হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এসএমএসের মাধ্যমে ভোট প্রার্থনা করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয় দেশজুড়ে। সেরা কবি-সাহিত্যিক, লেখক, অভিনেতা-অভিনেত্রীসহ আরও নানাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সেরাদের বাছাই করার বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু সেরা শিক্ষক বাছাই করার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। এবার হয়তো রিয়েলিটি শো
র মাধ্যমে আমরা সেরা শিক্ষকদের দেখার সুযোগ পাব।
এরই মধ্যে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতার প্রথম পর্ব শেষ হতে চলেছে। এ প্রতিযোগিতায় এখন আর নতুন করে শিক্ষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। কাজেই অবশিষ্ট পর্বের ওপর ভিত্তি করে রিয়েলিটি শো সফল করে তুলতে হলে প্রতিযোগিতার পরবর্তী বিষয়গুলো নিয়ে পত্রপত্রিকায় ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে এখন থেকেই। বিজ্ঞাপন দিতে হবে প্রচুর। সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে, শিক্ষা জগতে সৃজনশীল কাজ করার রয়েছে বিরাট সুযোগ, সমাজ উন্নয়নে শিক্ষকদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং মেধাবী শিক্ষকরাই পারেন শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে গতিশীল রাখতে। এ নিয়ে রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমেও প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।
আমি মনে করি, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিযোগিতা এবং রিয়েলিটি শো নিয়ে শুধু শিক্ষক বাতায়নে (www.teachers.gov.bd) প্রচার চালানোই যথেষ্ট নয়। কারণ সব শিক্ষকের পক্ষে নানা কারণে ইন্টারনেট ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধাও চালু নেই। কাজেই দেশজুড়ে অবস্থিত স্কুলগুলোয় রিয়েলিটি শো সম্পর্কে জানাতে হলে ব্যবহার করা যায় পোস্টার পেপার ও লিফলেট। এ ব্যাপারে স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সম্পৃক্ত করা দরকার। এছাড়া জেলাপর্যায়ে অবস্থিত তথ্য অফিসের সহায়তায়ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রচার চালানো যেতে পারে। প্রসঙ্গত, সেরা শিক্ষক নির্বাচনকালে নির্দিষ্ট নম্বরের ওপর ভিত্তি করে যে মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, সেখানে জুরিবোর্ডে যাতে পেডাগজি ও অ্যান্ড্রাগজি বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, রিয়েলিটি শোর মাধ্যমে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে, যার সঠিক প্রচার এবং দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে আরও পরিচিত করে তুলবে। এমনকি বাংলাদেশ হতে পারে অনেক দেশের কাছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক। তাহলেই আয়োজকদের এ উদ্যোগ সফল হবে বলে মনে করি।
মোঃ মুজিবুর রহমান : সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ
mujibur29@gmail.com